আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস-সালামকে রূহ দান করে জীবিত করে উপস্থিতি সবাইকে আদেশ করলেন তারা যেন আদমকে সম্মানসূচক সেজদা করে। ইবলিস এই বলে আদম আদম আলাইহিস-সালামকে সেজদা করা থেকে বিরত থাকল:
قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۖ قَالَ أَنَا۠ خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِى مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُۥ مِن طِينٍ ١٢
আল্লাহ বললেন, (অর্থ): ‘যখন আমি তোকে আদেশ করলাম, তখন কোন্ জিনিস তোকে সেজদা করা থেকে বিরত রাখল?’ সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেয়। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’। সূরা আরাফ ৭:১২
বাস্তবে ইবলিস তো আল্লাহ পাকের আদেশ লঙ্ঘন করে “রাজীম” অর্থাৎ মরদূদ বা বিতাড়িত হয়ে গেল (নাউযুবিল্লাহ)!
মানুষকে প্রবঞ্চনা দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে ইবলিস সুযোগ আর কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত চাইল।
আল্লাহ তাআলার ইলম (জ্ঞান) ও হেকমত (প্রজ্ঞা) অসীম। তিনি সবই জানেন। তাঁর কাছে কোনো কিছু গোপন নয়। কারা বিনা বাক্যে আল্লাহর আদেশ মান্য করে, কারা টাল-বাহানা করে, কারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের উপরে প্রশ্ন তোলে — সবই তাঁর জানা। ইবলিসকে সুযোগ, হায়াত সবই দিলেন কিন্তু এও বলে দিলেন যে কৃতজ্ঞ বান্দাদের উপর সে বিজয়ী হতে পারবে না। কৃতজ্ঞ বান্দারা আল্লাহর রহমতে সুরক্ষিত থাকবে।
আদম আলাইহিস সালাম ও উনার বিবিকে শয়তান প্রলোভন দেখাল। উনারা সরল মনে ভুলে গিয়ে সেই গাছের কাছে গেলেন, সেই গাছের ফল খেলেন যা তাদের জন্য নিষেধ ছিল! আল্লাহ তাআলা তাঁর জ্ঞান ও হেকমত অনুসারে উনাদের দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। সাথে শয়তানও মানুষকে প্রবঞ্চনার উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় স্থান পেল।
আদম আলাইহিস সালাম নিজের কাজের জন্য খুবই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেন। আল্লাহর কাছে ব্যাকুল হয়ে ক্ষমা চাইলেন। আসলে আদম আলাইহিস-সালাম আল্লাহর নেক বান্দাই ছিলেন; আবার ছিলেন নবীও। শুধু একটি পরীক্ষায় পড়ে উনি ভুলে গিয়েছিলেন আল্লাহর একটি কথা, উনি কখনোই আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘনকারী ছিলেন না। আমাদের জানা আছে যে, নবীগণ সবাই নিষ্পাপ। উনাদের থেকে কিভাবে পাপ বা গুনাহ সংঘঠিত হবে?! কখনো হয়নি। আদম আলাইহিস সালাম-এর লজ্জিত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া, বিনীত হওয়া—আল্লাহর কাছে উনার মর্যাদাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে!
এসব ঘটনা আমাদের সবার জানা। আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালাম ও ইবলিসের ঘটনা বেশ কয়েকবার কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন। কারণ মানুষের অর্থাৎ আমাদের সবার জন্য এ ঘটনায় অনেক বড় শিক্ষা রয়েছে। যদি বলা হয়, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাই আদম আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা—তাও সম্ভবত অত্যুক্তি হবে না!
কারণ, মানুষের জীবনের মূল কাজই হল তার মালিকের আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা। শয়তানকে একটি আদেশ করা হল, সে অমান্য করল। আদম আলাইহিস সালাম ও উনার বিবিকে একটি নিষেধ করা হল। সেখানে উনারা ভুলে বসলেন যে করণীয় ঠিক কী ছিল! ইবলিস হিংসুক, অহংকারী, হঠকারী। পক্ষান্তরে, আদম আলাইহিস সালাম পবিত্র আত্মার অধিকারী, বিনয়ী, ভুলে যাওয়ার পর স্মরণ আসা মাত্রই দ্রুত আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
আমাদের জন্য দুনিয়ার মৌলিক পরীক্ষাটি ঠিক এটাই! শয়তার পরীক্ষায় ফেল। আদম আলাইহিস সালাম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। আমরা কি ফেলকারী অনুসরণকারী হব নাকি যিনি উত্তীর্ণ হলেন উনার অনুসারী হব?
কুরআন আদম আলাইহিস সালাম ও ইবলিস-এর ঘটনা বার বার উল্লেখ করছে কেন?! কারণ, মানুষের মৌলিক ভুল এখানেই হয়। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ বা নিষেধ অমান্যতে। শয়তান নিজেকে বড় বা উত্তম ভাবে। অন্যের সাথে হিংসা করা, আল্লাহর গযব থেকে নির্ভয় হওয়া, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া শয়তানি বৈশিষ্ট্য। বিপরীতে পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা, ভুল অথবা গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করা নেক লোকদের বৈশিষ্ট্য। বিনয়ী হওয়া, আল্লাহ-মুখী থাকা, তওবা করতে বিলম্ব না করা—সবগুলো শিক্ষার উত্তম নমুনা পেশ করলেন আদম আলাইহিস সালাম।
আমরা যদি শয়তানের অনুসরণ করি, সে যেইসব করেছে বা আমাদেরকে করতে বলে সেই কাজ করি, তাহলে তার দলে থেকে আমাদেরও সেই পরিণতি ভোগ করতে হবে (সে তো যাবে দোজখে, চিরকাল আগুনে, আল্লাহর আযাবে—নাউযবিল্লাহ)! বিপরীতে আমরা যদি আদম আলাইহিস সালাম-এর পথ অনুসরণ করি, উনি যে পথ অবলম্বন করেছেন সেই পথ যদি আমরাও অবলম্বন করি, তাহলে তার দলে থেকে আমরাও সফল ও চির-শান্তি ভোগ করব!
সব নবী ও রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) মৌলিক শিক্ষা এক। আমাদের পরম সৌভাগ্য নয় তো কী—আমরা সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত! (হাজার-কোটি সালাম প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি!)
পূর্ববর্তী নবীগণের মতনই আমাদের প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতকে, আমাদেরকে বার বার শয়তানের পদাংক অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করেছেন। একটি হাদীসে স্পষ্ট আছে যেন কোনো গুনাহ হয়ে গেলে আমরা একটি নেক কাজ করে নিই। এটা শয়তানি বৈশিষ্ট্যের বিপরীত কারণ, শয়তান হঠকারী—সে গুনাহর পর গুনাহই করে। আমাদেরকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেখাচ্ছেন আমরা যেন গুনাহর পর গুনাহ না করে লজ্জিত হই, বিনীত হই। নেক কাজের দিকে ফিরি। এটি হল মানবজাতির পিতা আদম আলাইহিস সালাম-এর বৈশিষ্ট্য!
আমরা যে চরিত্রটি আঁকড়ে ধরব সেই পথের পরিণতির দিকেই আমরা ধাবিত হব। শয়তানি কাজের পরিণতি আল্লাহর গযব, জাহান্নাম। নেক কাজের পরিণতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাত। এবার আমরা বুদ্ধিমানের মতন সিদ্ধান্ত নিই!




