শারীরিক অবনতির জন্য মানুষ অসুস্থ হয় আর আত্মিক অবনতির কারণে মানুষ হয় অমানুষ। এতে বোঝা যায় আসলে মনুষ্যত্বের পরিচয় পেতে হলে শরীর নয়, আত্মিক বা রূহানী উন্নতি অনেক বেশি জরুরি। যে মানুষের মধ্যে পশু-প্রবৃত্তি প্রবল সে সবার কাছে ঘৃণিত। মনে করুন কোনো ব্যক্তির চেহারা খুব সুন্দর, সুঠাম স্বাস্থ্য আছে। রূপ লাবণ্যেও সে চমৎকার। কিন্তু অন্তর তার দূষিত, রূহানী জগত তার কলুষিত। আচরণ যদি হয় হিংস্র, কথা যদি হয় তিক্ত, অন্তরে যদি হিংসার আগুন থাকে – এর যেকোনোটিই তার আত্মার অবনতি ও রূহানী পদস্খলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ। এমন ব্যক্তির বাহ্যিক সৌন্দর্য কখনো সভ্য সমাজে সমাদৃত হয় না। হতে পারে তারই মতন যারা – তারা তাকে এ নামে আর সেই নামে ভূষিত করবে, বাহবা দেবে। কিন্তু জনসাধারণ ও গুণীজনদের কাছে সে ধিক্কৃত।
দেহ, স্বাস্থ্য ও শরীরের সৌন্দর্য কখনো অন্তর্জগতের কদর্যকে ঢেকে রাখতে পারে না। যদি পারেও তা বেশি থেকে বেশি এই পার্থিব জীবনে। যে জীবন এই জীবনের পর – তা শরীরকে পঁচিয়ে ফেলবে। কিন্তু আত্মা তো আর পঁচবে না। রূহানী অবস্থার ভিত্তিতেই কবর-জগতে প্রশ্ন করা হবে। কবি বলেন:
দেহ পালিশ করে তুমি পঁচতে যাচ্ছ কবরে
কেহ সেথায় থাকবে নাগো তোমার কোনো খবরে,
ভেতর তোমার বাহির হবে, কী রেখেছ সেথায় আজ
তখন সবি পড়বে ধরা কী করেছ কাজের কাজ।
আজ শারীরিক শক্তি আছে বলেই এই শক্তির দাপট আছে। আছে শুধুই শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। বুদ্ধি খাটানোর সুযোগ আছে বলেই বুদ্ধিকে খুব খাটানো হচ্ছে। আছে বুদ্ধি ‘কে কত বেশি লাইনে খাটাতে পারো’ – কেবল এরই গরজ। শক্তি আর বুদ্ধিতে পরাস্ত করতে পারলেই হল – মিলবে অনেক অনেক বাহবা। অথচ একটু চিন্তা করা উচিত ছিল, এই শক্তি আর বুদ্ধি কি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের জিনিস? এই শক্তি আর বুদ্ধির কি কোনো সীমাবদ্ধতা নেই? নেই কোনো শেষ?
অনেক শক্তিমান ও বুদ্ধিমান, শক্তি ও বুদ্ধিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে এমন জুলুম করছে যা সাধারণ বিবেকও মেনে নেয় না। শারীরিক শক্তি ও বুদ্ধি যখন বিবেকের আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে লাগামহীন হয়ে পড়ে তখন জুলুম-অত্যাচার, খেয়াল-খুশি মতন কাজ যেন মামুলি বিষয়। যার কাছে ধন-বল-যশ আছে সে যেন একদমই কারও মু্খাপেক্ষী নয়, তাই কারো পরোয়াও করে না সে। তার যা খুশি তাই করার পেছনে এটাই কারণ যে, সে মনে করে তার উপর ক্ষমতা ও অধিকার খাটানোর কোনো একচ্ছত্র মালিক নেই। আরও মনে করে এই পার্থিব অনুকূল অবস্থাই তার চূড়ান্ত বিজয়ের মাপকাঠি। এগুলোকে আঁকড়ে ধরে আরও আগালেই চূড়ান্ত সফলতা পেয়ে যাব। একেই আল্লাহ তাআলার কালামে বলা হয়েছে যে ‘প্রবৃত্তিকে যে খোদা মানে’। অর্থাৎ, যা-ই করে খেয়াল-খুশি মতন করে। আসলে আত্মিক অবনতির চরম অবস্থায়ই কেবল মানসিকতা এতটা নীচ হয়ে যায়। মনুষ্যত্ব বিলোপের কোনো এক ধাপে কেবল ‘শরীর-দেহ অবশিষ্ট’ মানুষই এমন চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাসে লালায়িত হয়।
আজ পর্যন্ত যত নবী আলাইহিমুসসালাম দুনিয়াতে এসেছেন তাদের আহ্বান কোনো ধন-বল-যশের দিকে ছিল না। বরং এগুলোর বিপরীতমুখী ছিল। তারা মানুষকে তার নিজস্ব সত্ত্বার মূল পরিচয় দিয়েছেন। তাও এভাবে যে, মানুষকে তার রবের পরিচয় সর্বপ্রথম জানিয়েছে এবং কে তাকে সৃষ্টি করল তা চিনিয়েছে। তখনই মানুষ বুঝেছে তার নিজের আসল পরিচয় কী। তখন সে এও বুঝেছে যে এই ধন-বল-যশ যা সে পেল – এর আসল উদ্দেশ্য কী? আর তার কীরূপ ব্যবহারের পরিণতিই বা কী?
যে মানুষের নিজের কোনো অস্তিত্ব ছিল না তার এত দাবি, তার নিজস্ব এত মতবাদ। পরীক্ষার বস্তু ধন-বল-যশকে মনোযোগের মূল বিষয় ও লক্ষ্য হিসেবে ঠাওর। এটা তখনই হয় যখন মানুষ নিজের সৃষ্টিকর্তাকে চিনবে না। তাই সে নিজের পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতেও ভুল করবে। এখানেই আবশ্যক হয় তলব তথা সত্যানুসন্ধানের মহৎ গুণ। যে ব্যক্তি সত্যকে খাঁটি ভাবে সন্ধান করবে তার অবস্থা এমনই হবে যে, সে বাহ্যিক বিষয়াদি দেখেই মেতে উঠবে না। যেকোনো বস্তু, ঘটনা ও অবস্থার অন্তর্নিহিত বিষয় জানতে চাবে। যারা ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিরও ঊর্ধ্বে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার আহ্বানকে পৌঁছায় (অর্থাৎ, আম্বিয়া আলাইহিমুসালামগণ ও পরবর্তীতে তাদের পথ অনুসরণকারী সত্যনিষ্ঠ উম্মত), তাদের কথা সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তি গুরুত্ব দিয়ে শুনবে ও বিবেচনা করবে। তাদের অন্তর সাক্ষ্য দেবে, ‘তাইতো! এই নবী রাসূলগণ ও সত্যের দাঈগণ, যারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাকে আহবান করছেন, তাদের কিভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করব?! তাদের কথা তো অনস্বীকার্য। নিতেই হয় মাথা পেতে।’
কী সে জিনিস যার দ্বারা কোনো ব্যক্তি সত্যকে উপলব্ধি করতে পারল? তা কি শারীরিক কোনো শক্তি, নাকি নাম-যশ, না বাহুবল? এর কোনোটিই নয়। বরং যেটা মাত্র বলা হল, সত্যানুসন্ধানের গুণ, আন্তরিক তলব। এটা অবশ্যই খোদা-প্রদত্ত; কিন্তু এমনতো বটেই যে তাতে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করা বা না করা – উভয় সুযোগই ছিল। এই আন্তরিক তলবের গুণটি আত্মিক বিষয়, শারীরিক নয়। নাম-যশ-ধন-বলের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এর। কিন্তু সত্যানুসন্ধানী-মানুষ এর দ্বারা কোথায় পৌঁছে গেছে?! কবি যথার্থই বলেছেন:
মাটির মানুষ শরীর নিয়ে উড়ছে নিম্ন আসমানে
রূহানী তেজে যায় সে পৌঁছে সুউচ্চ আরশ পানে।
—————————————————————————–
*এ কথার দ্বারা এগুলোর অস্তিত্ব, ব্যবহার অস্বীকার বোঝায় না। কারণ এগুলি আল্লাহ তাআলারই দান, এগুলো মানুষ সীমার মধ্যে ব্যবহার করবে – এটা তো শরিয়ত তথা আল্লাহ তাআলার বিধানই শিখিয়েছে।
** অর্থাৎ, এগুলো দুনিয়াতে পরীক্ষার বস্তু
ইনশাআল্লাহ চলবে….






