অতীতের ভাবনায় পড়ে থাকা যাবে না
আমরা অতীত নিয়ে চিন্তায় ডুবে থাকব না! আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার সাধনায় নিবেদিত থাকব ইনশাআল্লাহ। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতি মুহূর্ত আমাকে কবরের কাছাকাছি করছে। আমি কেন এমন চিন্তায় সময় ব্যয় করব যাতে কোনো লাভ নেই?!
যে কাজই করব দেখন সে কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট কিনা
লাভ রয়েছে বর্তমানের করণীয় ও বর্জনীয় কাজ খেয়াল করে আমল (ইবাদত, কাজ ইত্যাদি) করায়। উদাহরণস্বরূপ: এমন কাউকে সাহায্য করা যেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, এমন কোনো চিন্তা করা যেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, এমন কোনো কথা বলা যেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এমন কোনো কাজের আহ্বানে সাড়া না দেওয়া যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, এমন কোনো চিন্তা বা পরিকল্পনা আসলে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন তা থেকে বিরত হওয়া, এমন কারু সাথে চলা বা কথা বলা থেকে বিরত থাকা, যার সাথে চললে বা কথা বললে আল্লাহ রাগান্বিত হবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন (অর্থ): ভালো কথা বল, তাহলে সওয়াব লাভ করবে; আর মন্দ কথা বলা থেকে নীরব থাকো—তাহলে নিরাপদ থাকবে। হাকেম, তাবরানি
চলুন শোকরকারী হয়ে যাই! সবার কাছেই এমন অসংখ্য নেয়ামত আছে যার একটির শুকরিয়া আদায় করে কখনো শেষ করা যাবে না। শোকরকারী হলে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনে তৎপর হওয়া সহজ হয়ে যায়।
অপ্রয়োজনীয় কাজ, বিশেষ করে অনধিকারচর্চা পরিত্যাগ জরুরি
আর অপ্রয়োজনীয় কাজ ছাড়তে হবে। অপ্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে আমরা গুনাহও করে ফেলি অনেক! গুনাহ তো সবই গুনাহ। কিছু গুনাহ এমন যা মানুষ গুনাহ মনে করে না! এসব বড় মারাত্মক।
উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মধ্যে এমনও কেউ আছি যারা আল্লাহর পথ পেয়ে এখনও মুসলিম ভাই (বা বোন)দের বিষয়ে নিজেদের ধারণা পবিত্র করে নিতে পারিনি। মানে নিজে হয়ত সঠিক পথই পেয়েছি। কিন্তু ভুলে বসে আছি যে এসবই সম্ভব হয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমতে — নিজের কৃতিত্বে নয়। সেজন্যেই এমন হয় যে, অন্য মুসলিম ভাইদের দোষ চর্চা, তাদের দোষ দেখা, তাদেরকে হেয় করার মতন কাজের জন্যও আমরা সময় বের করছি – এটা মুসলিম হিসেবে হবে খুবই মন্দ এক অভ্যাস!
অন্যকে হেয় করা অর্থ অহংকারী বনে যাওয়া
সাইয়্যিদুনা মু‘আয (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন (অর্থ): “যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইকে তার কোনো গোনাহের কারণে বিদ্রূপ বা কটাক্ষ করে, সে নিজে সেই একই গোনাহে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না।” তিরমিযী
অন্যকে হেয় করা বর্তমানে বিস্তৃতি-লাভকারী এক ব্যাধি! অথচ এটা স্পষ্ট অহংকার। আর অহংকার নিকৃষ্ট হারাম কাজ।
নিজের পথ-মতকে আমরা ঠিক তো মনে করি – দ্বীনের ওপর চলার পথ তো সঠিক হতেই হবে। আর সঠিক পথকে (অর্থাৎ আল্লাহর শরীয়ত) সঠিক বিশ্বাস করাই উচিত, এটা তো জরুরি! কিন্তু এর ওপর ভিত্তি করে, নিজেকে উত্তম মনে করা, অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কখনোই ঠিক নয়! কোনোভাবেই ইসলাম এ শিক্ষা দেয় না যে, তুমি হকের উপর থাকলে অন্যকে হেয় কর। ইসলাম তো ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসা শিক্ষা দেয়।
সবাইকে থাকতে হবে ভাই-ভাই হয়ে। যদি আমি আল্লাহর পথে চলে থাকি, যে চলছে না – তাকে সুযোগ থাকলে স্নেহের সঙ্গে বোঝাতে হবে। যেখানে শাসন প্রযোজ্য, সীমার মধ্যে শাসনও করা যাবে। কিন্তু নিজেকেই উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মনে করা যাবে না। আমরা সবাই ভাই-ভাই।
যদি শরীয়তের মৌলিক বিষয়ে মত-পার্থক্য থাকে তাহলেও দুটি কাজ থেকে আমরা আমরা মুক্ত নই: সমাজে ফেতনা সৃষ্টিকারি কাজ থেকে বিরত থাকা এবং নিজেকে পাক-সাফ রাখা। যত্রতত্র মন্তব্য, টিপ্পনি, কথার দ্বারা ফেতনার আশংকা হয়, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়, অন্তরও অপবিত্র হয়ে যায়।
সব কাজেই সীমালঙ্ঘন অনুচিত। যার যতটুকু দায়-দায়িত্ব সেটি পালন করতে হয়। মুসলমানদেরকে পরস্পর ভাই হয়ে বসবাস করতে হবে। অন্য ভাইয়ের সংশোধনে মরিয়া হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি ঠিক নয় অন্যের প্রতি ঘৃণার দৃষ্টিপাত ও বিদ্বেষ পোষণ করা। আর না জেনে-বুঝে তিক্ততা সৃষ্টি করা আরও মন্দ কাজ।
অমুসলিমদের সঙ্গে আচরণেও সতর্কতা জরুরি
অমুসলিমের প্রতি আচরণের শিক্ষায় ইসলাম দিয়েছে। অমুসলিমের নিকৃষ্ট কর্মকান্ড অবশ্যই নিকৃষ্ট, কিন্তু তাদের এ কর্মকান্ডের ভিত্তিতে তাদের শেষ পরিণতি নিশ্চিতভাবে কী হবে, এটা তো আমাদের জানা নেই। আমাদের তো আমাদের শেষ পরিণতিই জানা নেই! অতএব, এখানে অবশ্যই বুঝতে হবে, আমার ঘৃণাটা কি আল্লাহর জন্য হচ্ছে কিনা(?) আর ঘৃণা প্রকাশটিও কি সুন্নাহ মুতাবেক হচ্ছে কিনা। অমুসলিমরা মুসলিমদের আখলাক পর্যবেক্ষণ করে থাকে। অনেকে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান পর্যন্ত হয়ে যায়! একই সমাজে মুসলিম-অমুসলিম একত্রে বসবাস করতে পারে, লেনদেন, এমনকি ব্যবসা করতে পারে। একজন মুসলমান অমুসলিমের স্বভাব,আচরণ, কার্য দ্বারা প্রভাবিত হবে না! সে নিজের স্বভাব, আচরণ ও কার্য দ্বারা অমুসলিমকে প্রভাবিত করবে।
আল্লাহর রহমতের প্রভাব কত শক্তিশালী! আমরা অধিকাংশ সেটি উপলব্ধি করতে পারিনি। পাশ্চাত্যে বহু মানুষ আজ ইসলামের ছায়াতলে আসছে। এর মূল কারণ মৌখিক দাওয়াত, ওয়াজ-লেকচার, বই-পুস্তকের প্রচারণা নয়। মূল কারণ হল ইসলামের সৌন্দর্য। যুগে যুগে ইসলামের আলো ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যমেই ছড়িয়েছে! মৌখিক দাওয়াত, ওয়াজ-লেকচার, বই-পুস্তক অবশ্যই কার্যকরী ও উপকারি। কিন্তু আখলাক-এর প্রভাব বহুগুণ বেশি কার্যকরী ও উপকারি।
আল্লাহর রহমত পেয়ে যারাই জীবনকে সত্যিই ইসলামের সৌন্দর্যে আলোকিত করার সাধনায় ব্রতী হয়েছে, তারাই সফল হবে। আল্লাহর রহমত পেয়ে তারা অহংকারী হয়নি, বিনীত হয়েছে। শোকর করেছে। এর ফলে তাদের অনেক শত্রুও তাদের মিত্র হয়ে গেছে।
আদর্শ হতে হবে আদর্শবানদের অনুসরণ করে
অতএব, ভালো মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করি! আদর্শবান হওয়ার চেষ্টা করি ইনশাআল্লাহ। তওবা করে পবিত্র হওয়ার দুটি দিক — ব্যক্তিগত বা আত্মিক উন্নয়ন এবং সামাজিক আচরণে উন্নয়ন। দুটির সংশোধন ও ক্রমোন্নতি কাম্য। কারণ আমরা কেউ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতে পারব না।
আল্লাহর রহমত তো আছেই! সেটি লাভের যোগ্য আমাকে হতে হবে (যোগ্য হওয়া অর্থ, আল্লাহর রহমত লাভের জন্য চেষ্টা সাধনার করা)। এজন্যেই আল্লাহর পথে মজবুত সাধনা প্রয়োজন।
যুগে যুগে আল্লাহর নেক বান্দাগণ কিভাবে চলেছেন। তাদের স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল। তাদের চিন্তা-চেতনা কিভাবে গড়ে উঠেছে — অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়, তারা নিজেকে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের পবিত্র শিক্ষায় আলোকিত করেছেন। অর্থাৎ কেবল শিক্ষা লাভ করে ক্ষান্ত হননি। সে অনুযায়ী আমলও করেছেন! এভাবেই তারা হয়েছেন অনুসরণীয়, মাশাআল্লাহ।
আল্লাহ! আমরাও তোমার পথে চলতে চাই। তোমার রাসূল ﷺ আমাদেরকে যে পথে দেখিয়ে গেছেন, সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম যে পথে চলে সফলতার সুমহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং পরবর্তীগণও হয়েছেন তোমার পুরস্কার পাওয়ার উপযোগী — আমাদেরকে সে পথেই তুমি পরিচালিত কর! আমীন।




