কুরআনরমযান/রোযা

কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষা: অবেহলাকারী নই তো?

নিঃসন্দেহে কুরআন তেলাওয়াত হল যিকিরের শ্রেষ্ঠ স্বরূপ ও অন্যতম ইবাদত। কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব জানা ও তদনুযায়ী আমল করা প্রতিটি মুসলামানের জন্য আবশ্যকীয়। অন্তত যে চেষ্টা করবে না — তার ওজর-আপত্তি গৃহিত হবে না, এ ভয় সবার থাকা উচিত!

কাউকে যখন সাধ্য-সামর্থ্য দেওয়া হয়, স্বাভাবিকভাবে তার জবাবদিহিতাও তেমন হয়ে থাকে। আমাদের যাদের সুস্থ চোখ-মুখ-কান রয়েছে, তাদের চিন্তা করা উচিত, এই নেয়ামতগুলো কতটুকু তেলাওয়াতে কুরআনে ব্যয় হচ্ছে। যে অনুপাতে নেয়ামত পেয়েছি, তার কতটুকু মূল্যায়ন করছি। অন্তত এ চিন্তা-চেষ্টার কী অবস্থা, প্রত্যেকের ভেবে দেখতে হবে।

কুরআন তেলাওয়াত ও আমরা

(চলুন দেখি আমি-আপনি কোথায়!)

এখানে সর্বসাধারণ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা হচ্ছে। অর্থাৎ মুখাতাব (audience) হুফফায ও উলামায়েকেরাম নন।

কুরআন তেলাওয়াতের দিক থেকে বিচার করলে আমাদের নানান অবস্থা ধরা পড়ে। একদিকে রয়েছে এমন মানুষ যারা সঠিকভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতেই শেখেনি! অন্যদিকে রয়েছে অনেকে যারা ছোটবেলায় শিখেছে। কিন্তু চর্চার অভাবে আর কুরআন মাজীদ শুদ্ধ করে পড়তে পারছে না। আবার অনেকে বড় হয়ে শিখেছে, কিন্তু সময় ও শ্রম সঠিকভাবে না দেওয়ার ফলে তেলাওয়াত শুদ্ধ নয়। অথচ ভুলই পড়ে যাচ্ছে — সেদিকে তেমন একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। আর যারা ঠিকমতন তেলাওয়াত শিখেছে, তাদের বড় এক অংশ ‘শেখা’টি একদমই মুলতবী করে দিয়েছে। অর্থাৎ, তেলাওয়াত জারি রাখলেও উন্নতির প্রচেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখেনি।

এভাবে কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি আমাদের সর্বসাধারণ মুসলমানদের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠির অবহেলা রয়েছে। তেলাওয়াত শিক্ষা হোক অথবা তেলাওয়াত নিয়মিত করা, অবহেলা যেক্ষেত্রেই হোক, এটা হালকা নয়! সব জাতীয় অবহেলা কুরআনের প্রতি আমাদের অবহেলারই ফল। ঈমানী দুর্বলতার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব আমাদের কতটুকু! যে মুসলমান কুরআন থেকে যত দূরে সে আল্লাহ পাক থেকে তত দূরে। যে কুরআনের সঙ্গে যত ভালো সম্পর্ক রাখে, আশা করা যায়, তার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার সম্পর্ক তত উন্নত পর্যায়ের!

আমাদের দেখার বিষয়

প্রত্যেকের দেখা উচিত, কুরআনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন? আর এটি বুঝতে হলে সর্বপ্রথম দেখতে হবে, আমার কুরআন তেলাওয়াতের অবস্থা কী। কারো তেলাওয়াত শুদ্ধ-অশুদ্ধ হওয়ার অবস্থা বলে দেবে কুরআনের সঙ্গে সে প্রাথমিকভাবে কতটুকু সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। যদিও এখানেই ব্যক্তির দ্বীনী অবস্থা যাচাই শেষ নয়, কিন্তু প্রাথমিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটি! এ কথা এজন্য বলা হল, কারো কুরআন পড়া সহি অর্থ আবার এ নয় যে, তাকে দ্বীনদার বলা যাবে! একজন দ্বীনদার মুসলমানের একটি বড় গুণ শুদ্ধ তেলাওয়াত, একমাত্র গুণ নয়।

মৃত্যুর পূর্বে যে চিন্তা করা অত্যন্ত জরুরি

একজন মুসলমান কিভাবে এ কথা চিন্তা করে যে, কবরে সে কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষাবিহীন যাবে?! কেয়ামতের দিন এত বড় লজ্জা নিয়ে যদি একজন মুসলমানকে উঠতে হয়, এর থেকে বড় লজ্জা (একজন ঈমানদারের জন্য) আর কী হবে?!

যাদের কোনো বিশেষ কারণে সুযোগই হয়নি, তাদের কথা অবশ্য ভিন্ন। যেমন, কেউ হয়ত গতকাল মুসলমান হয়ে আজ ইন্তেকাল করলেন। কিন্তু আমাদের কী কারণে কুরআন শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় ও সুযোগ হয়ে উঠল না?!

গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি। পার্থিব হায়াতটি আমরা কী সব ব্যস্ততায় পার করে দিচ্ছি(?) দেখা প্রয়োজন, কোন্ কাজগুলি কুরআন শিক্ষা থেকে আমাকে বিরত রাখছে। যারা শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত শিখেছিও, তারা দেখি, দৈনিক সন্তোষজনক পরিমাণ তেলাওয়াত হচ্ছে কিনা।

নিজ জীবনে অনেককিছুর অভাববোধ ও হাহাকার আমরা দেখি ও করে থাকি। কুরআন পড়া ‘না শেখার জন্য’ কার কতটুকু কষ্ট হয়েছে — ভেবে দেখি একটু। চিন্তা করুন, কোনোকিছুর অভাববোধ হলে তার সন্ধানে আমরা কিভাবে নেমে পড়ি! সেটি না পাওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হই না। কিন্তু কুরআন শেখার জন্য কি কখনো এমনটি হয়েছে?

আমরা অধিকাংশ মুসলমান আজ কুরআনের প্রাথমিক শিক্ষা (অর্থাৎ শুদ্ধ তেলাওয়াত শিক্ষা) থেকেই বহু দূর! কুরআনের ওপর আমল করা থেকে তো আমরা আরো কত যে দূরে, আল্লাহ জানেন!!

কুরআনের মাস আমাদেরকে সতর্ক করে যায়

কুরআনের মাস রমযান বছরে একবার এসে বিশেষ ও ব্যাপকভাবে কুরআনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কুরআন-শূণ্য অন্তরগুলো যেন এ অবস্থায়ই না থেকে যায়, এ অবস্থায় যেন এ জীবনগুলির অবসান না হয়ে যায় — রমযান মাসটি সতর্কবাণী ও বিশেষ স্মরণিকা বটে!

আল্লাহ তাআলার অপার রহমত তো বার বার সুযোগ দিচ্ছে, কিন্তু কী সব ওযু হাতে আমরা পিছপা হতে থাকি!? দেখে মনে হয়, কুরআনকে সময় দেওয়ার চেয়েও আমরা কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত, আরো লাভজনক কিছু পাওয়ার প্রচেষ্টায় রত (কত দুঃখজনক!)। অথচ কে না জানি, কুরআন তো শাহী ফরমান! এই আসমান-জমিনে কুরআন থেকেও দামি কিছু আছে কি?! কখনো নয়।

এখন করণীয়

অতএব, কুরআন শেখা-শেখানোর, কুরআনের শিক্ষা বিস্তার, ব্যবস্থাপনা-উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমাদের কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

যারা কখনো শিখিনি, শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত দ্রুত শেখা শুরু করতে হবে। যারা শিখে ভুলেছি, আবার শুরু করতে হবে তাদের! যারা শিখেছি তারা আরো অগ্রসর হই ও দৈনিক কুরআন তেলাওয়াতের মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি করি ইনশাআল্লাহ!

কুরআনের সঙ্গে সুসম্পর্ক মানেই আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে সুসম্পর্ক। এই সুমহান সর্বশেষ সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব নাযিল হয়েছে কার থেকে ও কার ওপর?! চিন্তা করুন আর কুরআনের মাহাত্ম্য নিয়ে ভাবুন! মৃত্যু অবধি কুরআনের প্রকৃত আযমত (সুউচ্চ মর্যাদা) ও বিস্ময়কর অসীম কুদরত কেউ বুঝে শেষ করতে পারবে না। এ কুরআনুল কারীম আমাদেরকে সম্মানিত করছে, সুস্থ রাখছে, দুনিয়া ও আখেরাতে আমরা একমাত্র মুক্তির মাধ্যম এ কুরআন!

কোনোভাবে পবিত্র কুরআনকে আর অবহেলা নয়! কুরআন নাযিলের মাস পবিত্র রমযানের এ পবিত্র সময়টিতে আসুন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে যাই যে, আমি কুরআন থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন থাকব না! নিজে তো কুরআনের সঙ্গে সংযুক্ত হবই, আমার পরিবার-পরিজনকেও কুরআনের সঙ্গে সংযুক্ত করবই করব ইনশাআল্লাহ।

কী দুআ করব
আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা সঠিক-শুদ্ধভাবে কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত ও আমলের তাওফীক চাই, এঁর মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা চাই, আমাদের সব অভাব-অভিযোগ ও অসুবিধা থেকে মুক্তি চাই, সর্বোপরি তাঁর কালামের সুপারিশের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে পানাহ আর তাঁর চির সন্তুষ্টির স্থান জান্নাত চাই!
আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: you are not allowed to select/copy content. If you want you can share it