চিন্তার খোরাক​

মানুষ নেক তাওফীক থেকে বঞ্চিত হয় কখন – ২

শাক্বীক বিন ইব্রাহীম رحمة الله عليه নেক তাওফীক থেকে বঞ্চিত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ যেটা উল্লেখ করেন তা হল, এলম অর্জনের পর তা থেকে সম্পূর্ণ বেপরোয়া থাকা, সেই এলম অনুযায়ী সাধ্য মত আমল না করা।

ইমাম মালেক رحمة الله عليه বলেছেন, এলম আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত এক নূর (হেদায়াতের আলো)। বাস্তবিকই এলম এক নূর, যা কিনা মানুষকে হক (সত্য) ও বাতিল (অসত্য) চেনায়। মৌলিক ভাবে এলম-এর উৎস হল কুরআন-সুন্নাহ। আজ তো আমরা দুনিয়ার বিদ্যা ও জ্ঞানকে এলম বলে আখ্যা দিয়ে থাকি! জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অবশ্যই বিদ্যা ও জ্ঞান। কিন্তু এগুলোর সাথে ওহীর জ্ঞান বা এলমে ওহীকে তুলনা করা চরম বোকামি।

এলম অর্জনের পর এলম আমলকে ডাক দেয়, অর্থাৎ, এলম আমলকে আহবান করে। আমল যদি এলম-এর ডাকে সাড়া দেয় তো এলম থাকে, তাতে আরও উন্নতি হয়। এলম-এর চাহিদাই হল তার উপর আমল করা হোক। তাই এলম অর্জনের পর বেপরোয়া ভাব থাকা অনুচিত। তদনুযায়ী আমল করা উচিত।কমপক্ষে আমলের ফিকির থাকা উচিত। আর যদি এমন হয় যে, এলম তো অর্জিত হয়েছে, কিন্তু আমলে গাফলতি হচ্ছে, আর গাফলতিও যে হচ্ছে তারও কোনো পরোয়া নেই – এটা বড় দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা! এলম তখন বিদায় নেয়। যা বাকি থাকে সেটা আর নূর নয়, এলম-এর খোলস মাত্র। এই খোলস কেয়ামতের দিন গাফেল ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

আজ আমরা যদি নিজেদের দিকে একটু লক্ষ করি, দেখা যাবে এলম অর্জন করছি। কিন্তু উদ্দেশ্য যেন শুধু জানা। জানছিও অনেক, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করছি না। সর্বসাধারণের কথা যদি বাদও দেয়া হয়, আমাদেরকে – যাদেরকে মানুষ ‘দ্বীনদার’ ভাবে, তারাও – আজ কোথায়?! জানা অনুযায়ী আমাদের আমল করা হচ্ছে কতটুকু? কত বড় আফসোসের কথা! বাস্তবিকই, সেই সংখ্যাটা কম যারা এলম অর্জন করেছে ও নিজ জীবনকে সুন্নাহর ছাঁচে গড়ে তুলেছে।

এলম অর্জনের পর তার উপর আমল না করা ও তা থেকে সম্পূর্ণ গাফেল হওয়াটা মানুষকে নেক তাওফীক থেকে বঞ্চিত করে দেয়।

কেউ কোনো বিশেষ ব্যক্তি, বুযুর্গ বা আল্লাহওয়ালার সাথে সম্পর্ক রাখে – এটা তো খুব উত্তম ও নেক হওয়ার জন্য সহায়ক। কিন্তু কেবলমাত্র এটাই মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়।যদি সৎ ব্যক্তিগণের সাথে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখার সাথে সাথে সৎ পথ ও সত্যের অনুসরণ করা হয় তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু এরূপ ধারণা করা যে, নেক মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখি বলেই আমি মুক্তি পেয়ে যাব – সম্পূর্ণ ভুল। সৎ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সাথে একটু সম্পর্ক রাখলাম আর চললাম মন মতন – একে নেক তাওফীক থেকে বঞ্চনার তৃতীয় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন শাক্বীক বিন ইব্রাহীম رحمة الله عليه।

সঙ্গ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের উপর সঙ্গের প্রভাব অনেক বেশি। এটা প্রতিনিয়তই দেখা যায় যে, শুধু খারাপের সাথে ক্ষণকাল অবস্থান করার ফলে নানান বিপদ এসে চেপেছে। এর বিপরীতে নেককারদের সাথে কিছুক্ষণ অবস্থানের ফলে ভালো অভ্যাস গড়ে উঠে, ভালো কাজের তাওফীক লাভ হয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার মনের ইচ্ছা, মতলব সবই জানেন। তিনি সর্বজ্ঞ। কোনো ব্যক্তি কার সাথে, কী উদ্দেশ্যে কতটুকু ভালোবাসা রাখে আল্লাহ তা জানেন। কোথায় স্বার্থের জন্য মেলামেশা হচ্ছে আর কোথায় নি:স্বার্থে থাকা হচ্ছে – সেই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ অবগত।

আন্তরিকতার সাথে নেক সঙ্গ অবলম্বন পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু নেক সঙ্গ অবলম্বন, নেককারদের সাথে বিশেষ সম্পর্ক যদি এই ধোঁকা দেয় যে, ব্যস! হয়ে গেছে। আমি বাকি সময় মন মতন চলব, যেটা ইচ্ছা করব – এমন চিন্তা ও কাজ ভয়াবহ। আমাদের অধঃপতনের অন্যতম কারণ এটা।

শয়তান ‘মু’আল্লিমুল মালা-ইকা’ (একদল ফেরেশতাদের শিক্ষক) হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ-এর হুকুমকে সে লঙ্ঘন করে বসল। কত বড় স্পর্ধা! এত নেক পরিবেশ ও নেক-সঙ্গ পেয়ে কি লাভ হল?! সুতরাং আমার বংশ এমন, আমি অমুক আলেম ও আল্লাহওয়ালার সাথে সম্পর্ক রাখি – এগুলো মুক্তির জন্য কখনোই যথেষ্ট নয়। আমি কি করছি – এটা দেখার বিষয়। এটা উপেক্ষা করে নেক তাওফীক পাওয়ার আশা করা একদম বৃথা।

চলবে ইনশাআল্লাহ

Last Updated on December 12, 2024 @ 8:41 am by IslamInLife বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: you are not allowed to select/copy content. If you want you can share it